ব্লিং লেদারের জুতায় বদলে গেল রংপুরের এক গ্রাম
একসময় খরা আর অভাবের জন্য পরিচিত ছিল রংপুরের তারাগঞ্জ উপজেলার ঘনিরামপুর গ্রাম। কাজের সন্ধানে পুরুষেরা গ্রাম ছেড়ে যেতেন দূরদূরান্তে, আর নারীরা থাকতেন ঘরকুনো জীবনে বন্দি। উত্তরাঞ্চলের এই এলাকাটি একসময় মৌসুমি খাদ্যাভাব বা মঙ্গার জন্য সারা দেশে পরিচিত ছিল, যেখানে কর্মসংস্থানের অভাবে মানুষকে বছরের একটা সময় প্রায় অনাহারে দিন কাটাতে হতো। সেই পরিস্থিতি এখন পুরোপুরি পাল্টে গেছে ব্লিং লেদার নামের একটি রপ্তানিমুখী জুতা কারখানার হাত ধরে। এই কারখানার তৈরি জুতা এখন পাড়ি দিচ্ছে ইউরোপ ও আমেরিকার বিভিন্ন দেশে, আর তার সুফল পাচ্ছেন গ্রামের হাজারো নারী।
তারাগঞ্জ সদর থেকে মাত্র তিন কিলোমিটার দূরে মহাসড়কের পাশে সাড়ে ৯ একর জমিতে ব্লিং লেদার কারখানাটি গড়ে তোলেন নীলফামারীর দুই ভাই মো. হাসানুজ্জামান ও প্রয়াত মো. সেলিম। যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী এই দুই ভাই আবাসন ব্যবসায় সফল হওয়ার পর দেশে বিনিয়োগের পরিকল্পনা করেন। প্রথমে নীলফামারী ও মিঠাপুকুরে হিমাগার স্থাপনের পর ২০১৭ সালে তাঁরা গড়ে তোলেন এই জুতার কারখানা, যেখানে বিনিয়োগ হয়েছে প্রায় সাড়ে ৩০০ কোটি টাকা। প্রবাসজীবনের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা তাঁদের শিল্পস্থাপনের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণে সহায়তা করেছে বলে জানান সংশ্লিষ্টরা।
ব্লিং লেদারের তিনটি ইউনিটে বর্তমানে কাজ করছেন প্রায় তিন হাজার শ্রমিক, যাঁদের প্রায় ৮০ শতাংশই নারী। প্রতিষ্ঠানের শ্রম কল্যাণ কর্মকর্তা জেসমিন আরার ভাষ্য অনুযায়ী, কারখানা চালুর পর এলাকার বেকারত্বের হার অনেকটাই কমে এসেছে। নারী শ্রমিকদের নিরাপত্তার কথা মাথায় রেখে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে নারী সুপারভাইজারও।
গ্রামীণ নারীদের হাতেই তৈরি হচ্ছে বিশ্বমানের জুতা
কাটিং ইউনিটে কাজ করা ভানু রানী জানান, প্রথমদিকে কাজ কঠিন মনে হলেও এখন তিনি এই কাজে দক্ষ হয়ে উঠেছেন এবং সন্তানদের ভবিষ্যতের জন্য সঞ্চয়ও করতে পারছেন। আগে ঢাকায় কাজ করা প্যাকেজিং শ্রমিক আদুরি রানী বলেন, নিজের গ্রামে ফিরে এসে এখন পরিবারকে সময় দিতে পারছেন, পাশাপাশি বাড়িতে গরু-ছাগল পালনও শুরু করেছেন।
স্থানীয় শ্রমিক লাভলী বেগমের কথায়, কারখানায় যোগ দেওয়ার আগে ঋণ করে সংসার চালাতে হতো তাঁকে। এখন নিয়মিত আয়ের পাশাপাশি সঞ্চয়ও করতে পারছেন, যা পরিবারে তাঁর মর্যাদা বাড়িয়েছে। শুধু নিজের সংসারই নয়, আশপাশের অনেক নারীকেও তিনি ব্লিং লেদারে কাজে যুক্ত হতে উৎসাহিত করেছেন বলে জানান।
স্থানীয় অর্থনীতি ও সমাজে ইতিবাচক প্রভাব
কারখানাটি চালু হওয়ার পর থেকে পুরো তারাগঞ্জ এলাকার আর্থসামাজিক চিত্রে বড় পরিবর্তন এসেছে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা। নিয়মিত আয়ের সুযোগ তৈরি হওয়ায় অনেক পরিবার এখন ঋণনির্ভরতা থেকে বেরিয়ে এসেছে। এলাকার শিক্ষার্থীদের মধ্যে স্কুল-কলেজে ভর্তির হার বেড়েছে বলেও জানান কয়েকজন অভিভাবক, কারণ নারীদের আয়ের একটি অংশ এখন সন্তানদের পড়াশোনার পেছনে ব্যয় হচ্ছে। এ ছাড়া কারখানাকেন্দ্রিক ছোট ছোট দোকানপাট, পরিবহনব্যবস্থা ও আবাসন খাতেও নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হয়েছে, যা পরোক্ষভাবে আরও বহু মানুষের জীবিকা নির্বাহে ভূমিকা রাখছে।
বিশ্ববাজারে বাড়ছে চাহিদা, সম্প্রসারণের পরিকল্পনা
কারখানা কর্তৃপক্ষের তথ্যমতে, প্রায় ৫১০ জন শ্রমিক আগে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে কাজ করলেও এখন নিজ এলাকায় ফিরে এসেছেন। শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি কাঠামো মেনে বেতন দেওয়ার পাশাপাশি রয়েছে মাতৃত্বকালীন ছুটি ও চিকিৎসা সুবিধা।
নির্বাহী পরিচালক মো. রেহান বখত জানান, সিনথেটিক জুতা তৈরি করা ব্লিং লেদার শতভাগ রপ্তানিমুখী এবং তাদের পণ্য যাচ্ছে পোল্যান্ড, তুরস্ক, জার্মানি, কানাডা, যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতসহ একাধিক দেশে। মানবসম্পদ বিভাগের ব্যবস্থাপক মো. আবদুল্লাহ আল ফারুক সরকার জানান, বর্তমানে দৈনিক ১০ হাজার জোড়া জুতা উৎপাদন হচ্ছে, সম্প্রসারণ শেষে যা প্রায় ৩৪ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবে।
দেশের চামড়া ও পাদুকা রপ্তানি খাত সামগ্রিকভাবে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে বলে মনে করেন খাতসংশ্লিষ্টরা। এই প্রেক্ষাপটে গ্রামীণ পর্যায়ে গড়ে ওঠা ব্লিং লেদারের মতো প্রতিষ্ঠান শুধু আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের অবস্থান মজবুত করছে না, বরং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কাছে শিল্পায়নের সুফল পৌঁছে দেওয়ার একটি বাস্তব উদাহরণও তৈরি করেছে বলে মত দেন বিশ্লেষকেরা।
২০২৪ সালে রূপালী ব্যাংকের কাছ থেকে সর্বোচ্চ রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানের স্বীকৃতি পাওয়া এই কারখানা সম্প্রতি পরিদর্শন করেছেন প্রধান উপদেষ্টার অর্থনৈতিক বিষয়ক বিশেষ সহকারী আনিসুজ্জামান চৌধুরী। স্থানীয় ব্যবসায়ী ও জনপ্রতিনিধিদের মতে, এই কারখানা প্রমাণ করেছে সঠিক পরিকল্পনা ও নারীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত হলে গ্রামেও শিল্পায়ন সম্ভব।
ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. হাসানুজ্জামান জানান, দৈনিক ৫০ হাজার জোড়া জুতা উৎপাদনের লক্ষ্যে তাঁরা কাজ করছেন এবং ভবিষ্যতে দেশীয় বাজারেও পণ্য সরবরাহের পরিকল্পনা রয়েছে তাঁদের। তাঁর ভাষায়, ভাইয়ের স্বপ্ন ছিল গ্রামের মানুষ, বিশেষত নারীদের হাতে কাজের সুযোগ তুলে দেওয়া—আর সেই স্বপ্নই এখন ব্লিং লেদারের মাধ্যমে একটি টেকসই ও সম্ভাবনাময় শিল্পে রূপ নিয়েছে।
আরও পড়ুন:পশুপালনে আয় বেশি, ফসলে কম: ক্ষুদ্র কৃষকদের বিবিএস জরিপ

