লাইফস্টাইল

টুথপেস্টে মাইক্রোপ্লাস্টিক: আতঙ্ক নয়, প্রয়োজন সঠিক সচেতনতা

সম্প্রতি টুথপেস্টে মাইক্রোপ্লাস্টিক থাকার খবর ছড়িয়ে পড়ার পর সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপক উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনার ঝড় ওঠার পর অনেকেই দাঁত ব্রাশ করা কমিয়ে দিয়েছেন, কেউ কেউ আবার টুথপেস্ট ব্যবহার একেবারে বন্ধ করে দেওয়ার কথাও ভাবছেন। অথচ চিকিৎসাবিজ্ঞান বহু আগে থেকেই প্রমাণ করেছে, মুখগহ্বরের স্বাস্থ্য অবহেলা করলে তার পরিণতি হতে পারে সুদূরপ্রসারী ও মারাত্মক।

টুথপেস্টে মাইক্রোপ্লাস্টিক নিয়ে আতঙ্কের সূত্রপাত

কয়েকটি আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, কিছু প্রসাধনসামগ্রী ও পরিষ্কারক পণ্যে অতি ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণা মিশে থাকতে পারে। এই প্রতিবেদনগুলো প্রকাশের পরই দেশের গণমাধ্যম ও সামাজিক মাধ্যমে বিষয়টি ব্যাপক প্রচার পায়। ফলে ভোক্তাদের একটি বড় অংশ বিভ্রান্ত হয়ে পড়েন এবং নিয়মিত দাঁত মাজার অভ্যাস থেকে সরে আসার প্রবণতা দেখা যায়।

তবে বাস্তবতা হলো, এই ধরনের সংবাদ যাচাই-বাছাই ছাড়াই ছড়িয়ে পড়লে জনস্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে উল্টো প্রভাব ফেলতে পারে। [সংবাদ সূত্রে জানা গেছে / বিস্তারিত আরও পড়ুন: বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনের লিংক দিন]

দৈনন্দিন জীবনে টুথপেস্ট কেন অপরিহার্য

মুখের স্বাস্থ্য রক্ষায় টুথপেস্টের ভূমিকা বহুমুখী। এটি শুধু দাঁত পরিষ্কার রাখার উপাদান নয়, বরং সামগ্রিক স্বাস্থ্যরক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

দাঁত ও মাড়ির সুরক্ষায় ভূমিকা

টুথপেস্ট দাঁতে জমে থাকা প্লাক ও খাদ্যকণা অপসারণ করে, ফ্লোরাইডের মাধ্যমে দাঁতের এনামেল শক্তিশালী করে এবং দাঁতের ক্ষয় প্রতিরোধ করে। একই সঙ্গে এটি মুখের দুর্গন্ধ কমাতে এবং মাড়ির প্রদাহ প্রতিরোধেও কার্যকর ভূমিকা রাখে।

অবহেলার দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি

নিয়মিত ও সঠিক পদ্ধতিতে ব্রাশ না করলে ক্যাভিটি, জিনজিভাইটিস ও পেরিওডন্টাইটিসের মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে, যা অকালে দাঁত হারানোর কারণ হতে পারে। এমনকি দীর্ঘমেয়াদি মাড়ির রোগের সঙ্গে ডায়াবেটিস, হৃদ্‌রোগ, স্ট্রোক এবং গর্ভাবস্থার নানা জটিলতার সম্পর্কও একাধিক গবেষণায় উঠে এসেছে। ফলে শুধু মাইক্রোপ্লাস্টিকের আশঙ্কায় টুথপেস্ট ব্যবহার বন্ধ করা যুক্তিসংগত সিদ্ধান্ত নয়।

টুথপেস্টে মাইক্রোপ্লাস্টিক আসলে কী

মাইক্রোপ্লাস্টিক বলতে বোঝায় পাঁচ মিলিমিটারের চেয়ে ছোট আকারের প্লাস্টিক কণা। অতীতে কিছু টুথপেস্ট ও প্রসাধনীতে স্ক্রাবিং বা পরিষ্কারক উপাদান হিসেবে এ ধরনের কণা ব্যবহারের নজির ছিল। তবে পরিবেশগত ক্ষতির বিষয়টি সামনে আসার পর বিশ্বের বহু দেশ এসব উপাদান নিষিদ্ধ বা সীমিত করেছে।

দেশের কয়েকটি শীর্ষস্থানীয় টুথপেস্ট প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সরাসরি আলোচনায় জানা গেছে, তারা ইচ্ছাকৃতভাবে মাইক্রোপ্লাস্টিক ব্যবহার করে না এবং কাঁচামাল নির্বাচনে যথেষ্ট সতর্কতা অবলম্বন করে। তবে কাঁচামাল সংগ্রহ বা প্যাকেজিং প্রক্রিয়ার মাধ্যমে অনিচ্ছাকৃতভাবে সামান্য দূষণের সম্ভাবনা একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। এই কারণেই টুথপেস্টে মাইক্রোপ্লাস্টিক নিয়ে সতর্কতা জরুরি হলেও তা যেন আতঙ্কে পরিণত না হয়, সে বিষয়টি নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

বিজ্ঞান কী বলছে টুথপেস্টের মাইক্রোপ্লাস্টিক নিয়ে

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, খাবার, পানি ও বাতাসের মাধ্যমে মাইক্রোপ্লাস্টিক মানবদেহে প্রবেশ করছে, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য একটি উদ্বেগের বিষয় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। তবে নির্দিষ্টভাবে টুথপেস্টে মাইক্রোপ্লাস্টিক কতটা ক্ষতিকর, তা এখনো সুনির্দিষ্টভাবে প্রমাণিত হয়নি।

এই অনিশ্চয়তার কারণে সংস্থাটি দীর্ঘমেয়াদি ও উচ্চমানসম্পন্ন গবেষণা পরিচালনার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, এখন পর্যন্ত কোনো দেশে টুথপেস্ট ব্যবহারের বিরুদ্ধে সাধারণ কোনো নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়নি। ফলে বিদ্যমান বৈজ্ঞানিক তথ্যের ভিত্তিতে টুথপেস্ট ব্যবহার বন্ধ করার কোনো যৌক্তিকতা নেই।

টুথপেস্টে মাইক্রোপ্লাস্টিক এড়াতে করণীয়

সচেতন ভোক্তা হিসেবে কিছু সহজ পদক্ষেপ মেনে চললে ঝুঁকি অনেকটাই কমিয়ে আনা সম্ভব।

  • সব সময় বিএসটিআই অনুমোদিত টুথপেস্ট ব্যবহার করা উচিত।
  • টুথপেস্ট কেনার আগে উপাদানের তালিকায় পলিইথিলিন, পলিপ্রোপিলিন বা অ্যাক্রিলেটস কোপলিমারের মতো সিনথেটিক পলিমার আছে কি না, তা যাচাই করা জরুরি।
  • ব্রাশ করার সময় টুথপেস্ট যেন গিলে ফেলা না হয়, বিশেষ করে শিশুদের ক্ষেত্রে অভিভাবকের সরাসরি তত্ত্বাবধান প্রয়োজন।
  • প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য ব্রাশের তিন ভাগের এক ভাগ বা মটরদানার সমান পরিমাণ টুথপেস্টই যথেষ্ট।
  • মাড়ির ক্ষতি এড়াতে নরম ব্রিসলযুক্ত ব্রাশ ব্যবহার করা উচিত এবং সঠিক পদ্ধতিতে ব্রাশ করার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে।

আরও পড়ুন :এসি বিদ্যুৎ বিল কত আসে? ১.৫ টন এসির মাসিক খরচ জানুন

শেষ কথা

টুথপেস্টে মাইক্রোপ্লাস্টিক নিয়ে উদ্বেগ সম্পূর্ণভাবে অমূলক নয়, তবে তা নিয়ে অতিরিক্ত আতঙ্কিত হয়ে দাঁত মাজার অভ্যাস ত্যাগ করা আরও বড় স্বাস্থ্যঝুঁকি ডেকে আনতে পারে। বিজ্ঞানভিত্তিক তথ্য অনুসরণ করে, নির্ভরযোগ্য ব্র্যান্ডের পণ্য বেছে নিয়ে এবং সঠিক নিয়মে ব্রাশ করলে এই ঝুঁকি ন্যূনতম পর্যায়ে রাখা সম্ভব। সচেতনতাই এখানে মূল সমাধান, আতঙ্ক নয়।


লেখক: ডা. মো. আসাফুজ্জোহা, মহাসচিব, বাংলাদেশ ফেডারেশন অব ডেন্টাল সায়েন্স

c24newsbd.com

c24newsbd.com

মোহাম্মদ সানাউল্লাহ, সি২৪ নিউজ বিডি-এর প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান সম্পাদক। সঠিক সময়ে বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ পাঠকদের কাছে পৌঁছে দিতে নিয়োজিত একজন মাল্টিমিডিয়া কনটেন্ট ক্রিয়েটর এবং গ্রাফিক ডিজাইনার।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *