নীলের বুকে সাদার উৎসব—এসেছে ঋতুরানী শরৎ
মুহাম্মদ সানাউল্লাহ চাটগামী
শরৎ এসেছে আপন মহিমায়
শরৎ এসেছে—আপন মহিমায়, আপন সৌন্দর্যে, আপন মায়াবী আবেশে।
বর্ষার নিবিড় ঘনঘটা সরিয়ে নির্মল নীল আকাশের বুকজুড়ে আজ তার রাজত্ব। কখনো মান-অভিমানের মতো ঝুম বৃষ্টি, কখনো বা মেঘবালিকার সঙ্গে রৌদ্রের লুকোচুরি—প্রকৃতির এই চিরচেনা খেয়ালিপনায় শরৎ যেন তার আগমনী বার্তা লিখে দেয় নীলের ক্যানভাসে।
সারি সারি কাশবনের রূপালী ঢেউ বাতাসের মৃদু পরশে দুলে দুলে যেন বলে—
“শরৎ এসেছে, শরৎ এসেছে!”
নদী, বিল, পুকুর আর হাওরের স্বচ্ছ জলের বুকে শুভ্র শাপলার পাগল করা হাসি, কোমল বাতাসে দুলে ওঠা কাশফুলের শুভ্রতা, আর দূর্বাঘাসের ডগায় জমে থাকা শিশিরবিন্দু—মনে হয় রাতের আঁধার ভেঙে অগণিত মুক্তো ছড়িয়ে দিয়েছে প্রকৃতি।
বেলি, দোলনচাঁপা, বকুল, পদ্ম, কাশফুল, কেয়া, মাধবী, মল্লিকা, মালতী, জুঁই—নাম জানা-অজানা অগণিত ফুলের সুরভিতে বাতাস হয়ে ওঠে মাদকতাময়। আর শিশিরভেজা শিউলি ফুলের অনুপম সৌন্দর্য নিয়ে যখন ভোর নামে, তখন মনে হয়—ঋতুরানী শারদ সত্যিই এসে দাঁড়িয়েছে আমাদের দুয়ারে।
শরতের সকাল বড় মায়াময়।
শিশিরভেজা ধানের শীষে কোমল সূর্যের আলো পড়ে ঝিলমিল করে ওঠে। পুকুরের জলে ভেসে থাকা শুভ্র শালুক হাসে নীরবে। মাথার ওপরে বিস্তীর্ণ নীল আকাশ, তার বুকে ভেসে বেড়ানো তুলোর মতো সাদা মেঘ—কখনো কাছে, কখনো দূরে। সবুজ মাঠের বুক চিরে শালিক, ময়না, টিয়ের ঝাঁক উড়ে যায় আপন ঠিকানার সন্ধানে।
আকাশে, বাতাসে, ঘাসের ডগায়, নদীর জলে—সবখানেই শরতের শান্ত, স্নিগ্ধ পরশ। মনে হয়, শরৎরানি তার অদৃশ্য বীণার তারে মায়াবী কোনো সুর বাজিয়ে প্রকৃতির প্রতিটি কোণে নিজের উপস্থিতি জানান দিচ্ছে।
ভাদ্র আর আশ্বিন—এই দুই মাস যেন শরতের নিজস্ব কাব্য।
শিশিরভেজা শান্ত সকাল, কোমল রোদের স্নিগ্ধতা, ধবল মেঘের ভেলায় ভাসতে থাকা তপ্ত দুপুর, আর গোধূলির রাঙা আকাশে পাখিদের নীড়ে ফেরার দৃশ্য—সব মিলিয়ে ভাদ্র-আশ্বিনের নীল আকাশ প্রকৃতির এমন এক সৌন্দর্যের জন্ম দেয়, যার সঙ্গে অন্য কোনো ঋতুর তুলনা চলে না।
আর শরতের জোৎস্না?
তার সঙ্গে অন্য কোনো ঋতুর জোৎস্নার তুলনা করা যেন অন্যায়।
ভরা পূর্ণিমার রাতে আকাশভরা তারার মেলা, চারদিকে ধবধবে জোৎস্নার প্লাবন—মনে হয়, সৃষ্টিকর্তা তাঁর সমস্ত সৌন্দর্য একত্র করে পৃথিবীর বুকে ঢেলে দিয়েছেন। নিস্তব্ধ রাতের সেই জোৎস্নায় প্রকৃতি হয়ে ওঠে স্বপ্নময়, আর হৃদয় হারিয়ে যায় এক অদৃশ্য মায়ার রাজ্যে।
প্রকৃতি আর শরতের এই প্রেম যেন এক অনন্য মহাকাব্য—
কখনো মহাপ্রলয়ের মতো উন্মাতাল, আবার কখনো মহাসৃষ্টির মতো নির্মল ও শান্ত। এ প্রেমে আছে বিরহের ব্যাকুলতা, মিলনের মুগ্ধতা, নীরবতার সুর আর সৌন্দর্যের অনন্ত আহ্বান।
তাই তো কোনো কবি শরতের বন্দনা না করে তার অমর কাব্য সম্পূর্ণ করতে পারেননি।
যে হৃদয় প্রকৃতিকে ভালোবাসে, যে চোখ সৌন্দর্যের ভাষা বোঝে, যে মন নীল আকাশের দিকে তাকিয়ে অকারণে হারিয়ে যেতে জানে—শরৎ তাকে একবার হলেও ব্যাকুল করেছে, তাড়িত করেছে, প্রেমে ফেলেছে।
শারদের শুভ্র কাশফুলে, শিউলির ঘ্রাণে, শিশিরের স্বচ্ছতায়, নীল আকাশের গভীরতায় আর জোৎস্নার মায়াবী আলোয়—প্রকৃতি যেন নিঃশব্দে বলে যায়,
শরৎ শুধু একটি ঋতু নয়—
শরৎ এক অনুভূতি, এক প্রেম, এক অপার্থিব সৌন্দর্যের নাম।
আর সেই সৌন্দর্যের কাছে এসে প্রতিটি প্রকৃতিমনা হৃদয় একবার হলেও থমকে দাঁড়ায়—
মুগ্ধ হয়, ব্যাকুল হয়, প্রেমে পড়ে।
কারণ শরৎ এসেছে—
আপন মহিমায়, আপন রূপে,
আপন মায়াবী ভালোবাসায়।
আরোও পড়তে পারেন: কদম ফুল: বর্ষার অগ্রদূত

